তাঁর জন্য পৃথিবী এখন দ্রুতই অনেক ছোট হয়ে আসছে।

 

নজর এখন এস আলম–সংশ্লিষ্ট মালয়েশিয়ার দুই হোটেলের দিকে, নানা দেশে তদন্ত বিস্তৃত হচ্ছে







বাংলাদেশের বিতর্কিত ব্যবসায়ী ও সিঙ্গাপুরের নাগরিক মোহাম্মদ সাইফুল আলমের (এস আলম) বিশাল ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য নিয়ে ক্রমাগত তদন্ত চলছে। এই সাম্রাজ্যের ভিত্তি চট্টগ্রাম থেকে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত। কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, এস আলম তাঁর ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের বেশির ভাগটাই গড়ে তুলেছেন পাচারের অর্থ দিয়ে।

মে মাসের মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে এস আলমকে ঘিরে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে। সাইপ্রাসে তাঁর ও তাঁর স্ত্রীর যৌথ মালিকানাধীন একটি বিলাসবহুল আবাসিক সম্পত্তি আদালতের নির্দেশে জব্দ করা হয়েছে। একই সময়ে বাংলাদেশের একটি আদালত তাঁর অনুপস্থিতিতে তাঁকে পাঁচ মাসের কারাদণ্ড দিয়েছেন।

একই সময়ে সিঙ্গাপুরের তদন্তকারীরা তাঁর ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য নিয়ে তদন্ত চালাতে শুরু করেছে। শুধু সিঙ্গাপুরেই তাঁর সম্পদের পরিমাণ ১০০ কোটি মার্কিন ডলার (প্রায় ৪০০ কোটি রিঙ্গিত) ছাড়িয়ে গেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এখন মনোযোগ মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরের দুটি পরিচিত হোটেলের দিকে। এগুলোর সঙ্গে এস আলম গ্রুপের সম্পর্ক রয়েছে। আর এস আলম হলেন এ গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান। এগুলো হলো কুয়ালালামপুরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত রেনেসাঁ কুয়ালালামপুর হোটেল অ্যান্ড কনভেনশন সেন্টার এবং এর পাশের ফোর পয়েন্টস বাই শেরাটন কুয়ালালামপুর সিটি সেন্টার।

দুটি হোটেলের মালিক ভেনচুরা ইন্টারন্যাশনাল এসডিএন বিএইচডি (আগের নাম কানালি লজিস্টিকস এসডিএন বিএইচডি)। প্রতিষ্ঠানটি এস আলম গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে জানা গেছে।

২০১৬ সালে আইজিবি বিএইচডি (তৎকালীন নাম আইজিবি কর্প বিএইচডি) মূল রেনেসাঁ হোটেলটি ভেনচুরা ইন্টারন্যাশনালের কাছে ৭৬ কোটি ৫০ লাখ রিঙ্গিতে বিক্রি করেছিল।

ff f

ভেনচুরা ইন্টারন্যাশনাল কোম্পানির তথ্য অনুসন্ধান করে দেখা গেছে, ওয়াইআইএফ হোল্ডিং মালয়েশিয়া এসডিএন বিএইচডির হাতে প্রতিষ্ঠানটির ১০০ শতাংশ মালিকানা আছে।

ওয়াইআইএফ হোল্ডিং মালয়েশিয়ার তথ্য অনুসন্ধান করে দেখা গেছে, ওং ওয়াই চিয়ং, পু সিন ইয়ে এবং আরিভালাগান চোকালিংগামের পরিচালক। প্রতিষ্ঠানটি সম্পূর্ণভাবে সিঙ্গাপুরের ওয়াইআইএফ হোল্ডিং পিটিই লিমিটেডের মালিকানাধীন।

ওয়াইআইএফ হোল্ডিং পিটিই লিমিটেডের তথ্য ঘেঁটে দেখা যায়, এটি মূলত আর্থিক ও বিমাবহির্ভূত খাতে কাজ করা কোম্পানিগুলোর জন্য একটি হোল্ডিং কোম্পানি হিসেবে কাজ করে। কোম্পানিটির শেয়ারহোল্ডার হিসেবে আছে ‘হিলড্রিকস এশিয়া গ্রোথ ফান্ড ভিসিসি’।

প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক হিসেবে চু কি সিয়ংয়ের নাম তালিকাভুক্ত আছে। তিনি একই সঙ্গে হিলড্রিকস ক্যাপিটালের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও), নির্বাহী পরিচালক এবং প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা (সিআইও)।

হিলড্রিকস ক্যাপিটালের বিনিয়োগ পোর্টফোলিওতে মালয়েশিয়ার রাবার প্রস্তুতকারী ও পরিবেশক প্রতিষ্ঠান জিআইআইবি হোল্ডিংস বিএইচডির নাম আছে।

এইচএজিএফ ইনভেস্টমেন্ট (আই) পিটিই লিমিটেড একসময় এই প্রতিষ্ঠানে ১৬ দশমিক ৫৬ শতাংশ শেয়ারের মালিক ছিল। এইচএজিএফ ইনভেস্টমেন্ট (আই) পিটিই লিমিটেড হলো হিলড্রিকস এশিয়া গ্রোথ ফান্ড ১-এর শতভাগ মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান। তবে গত ২১ মে দাখিল করা নথিতে দেখা গেছে, তারা পরে কিছু শেয়ার বিক্রি করে দিয়েছে। তারা আর উল্লেখযোগ্য শেয়ারহোল্ডার হিসেবে থাকেনি।

জিআইআইবি নানা কারণে সংবাদের শিরোনামে এসেছে। এর মধ্যে আছে—দুর্নীতির তদন্ত, করপোরেট ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ, আইনি বিরোধ ও আর্থিক ক্ষতি।

ভেনচুরা ইন্টারন্যাশনাল ২০২০ সালে বড় ধরনের সংস্কারের জন্য রেনেসাঁ হোটেলটি বন্ধ করে দিয়েছিল। পরে ২০২৩ সালের অক্টোবরে মালয়েশিয়ার ম্যারিয়ট ইন্টারন্যাশনালের প্রথম দ্বৈত-ব্র্যান্ডের সম্পত্তি হিসেবে এটি আবার চালু করা হয়। এর পশ্চিম অংশে রেনেসাঁ হোটেল এবং পূর্ব অংশে নতুন ফোর পয়েন্টস বাই শেরাটন।

ভেনচুরা ইন্টারন্যাশনাল ২০২০ সালে বড় ধরনের সংস্কারের জন্য রেনেসাঁ হোটেলটি বন্ধ করে দিয়েছিল। পরে ২০২৩ সালের অক্টোবরে মালয়েশিয়ার ম্যারিয়ট ইন্টারন্যাশনালের প্রথম দ্বৈত-ব্র্যান্ডের সম্পত্তি হিসেবে এটি আবার চালু করা হয়। এর পশ্চিম অংশে রেনেসাঁ হোটেল এবং পূর্ব অংশে নতুন ফোর পয়েন্টস বাই শেরাটন।

ম্যারিয়টের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চ্যানেলগুলোয় এখনো দুই হোটেলের মালিক হিসেবে ভেনচুরা ইন্টারন্যাশনালের নাম রয়েছে। মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষ এই হোটেলগুলোর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিয়েছে বা সম্পত্তিগুলোর ওপর কোনো জব্দাদেশ দিয়েছে বলে এখন পর্যন্ত কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।

তবে সূত্রগুলো বলছে, যেহেতু আন্তর্জাতিক তদন্তের পরিধি অনেক বিস্তৃত, তাই বাংলাদেশ যদি বিভিন্ন দেশে সম্পদ পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা চালায়, তাহলে মালয়েশিয়ায় এস আলম গ্রুপের সঙ্গে সম্পর্কিত সম্পদও তদন্তের আওতায় আসতে পারে। এ ঘটনার সময়কাল কূটনৈতিক দিক থেকেও একটি উল্লেখযোগ্য মাত্রা যোগ করেছে।

বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রীর সফর

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির বিজয়ের পর দলটির নেতা তারেক রহমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন। তিনি তাঁর প্রথম বিদেশ সফরের গন্তব্য হিসেবে মালয়েশিয়াকে বেছে নিয়েছেন।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফরের প্রথম আমন্ত্রণ এসেছিল ভারত থেকে। এরপর মালয়েশিয়া এবং চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং আমন্ত্রণ জানান। গত সপ্তাহে মালয়েশিয়ার সফরটি চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে বলে জানা গেছে। ২১ ও ২২ জুন দুই দিনের এই কুয়ালালামপুর সফর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। সফরের দ্বিতীয় দিনে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে তারেক রহমানের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হওয়ার কথা আছে।

fff

কূটনৈতিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ হাইকমিশন গত ২৪ মে মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সফর নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করে। এর কয়েক দিন আগে সাইপ্রাসের আদালত এস আলমের সম্পত্তি জব্দ করেছিল। বাংলাদেশ হাইকমিশনের সঙ্গে আলোচনার পর মালয়েশিয়া ইতিবাচক সাড়া দেয়। ১ জুন আনোয়ার ইব্রাহিম আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ নিশ্চিত করেন।

সফরকালে কী কী বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে এতে অভিবাসন, শ্রমবাজার, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং শিক্ষাবিষয়ক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা আছে। বর্তমানে ১০ হাজারের বেশি বাংলাদেশি শিক্ষার্থী মালয়েশিয়ার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর প্রথম বিদেশ সফরের জন্য এমন একটি দেশকে বেছে নিচ্ছেন, যেখানে সম্ভবত এস আলম গ্রুপের সবচেয়ে প্রকাশ্য আন্তর্জাতিক সম্পদ রয়েছে। আর তা হলো—মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে থাকা ম্যারিয়ট ব্র্যান্ডের দুটি বড় হোটেল। পর্যবেক্ষকদের মতে, এ ঘটনাকে নিছক কাকতালীয় বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

তারেক রহমানের সফরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকারের জায়গা হলো মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য বিদেশি শ্রমবাজার আবারও চালু করা।

অনেক অভিযোগ ওঠার পর ২০২৪ সাল থেকে এই শ্রমবাজার বন্ধ রয়েছে। অভিযোগগুলোর মধ্যে ছিল আধুনিক যুগের ঋণদাসত্বের মতো পরিস্থিতি। শ্রমিকদের মালয়েশিয়ায় চাকরি পেতে বিপুল ঋণের বোঝা নিতে হতো। বিষয়টি ২০২৩ সালে চরমে পৌঁছায়। তখন অনেক শ্রমিক জনপ্রতি ৬ হাজার ৬০০ মার্কিন ডলার (প্রায় ৮ লাখ টাকা) পর্যন্ত খরচ করে মালয়েশিয়ায় পৌঁছানোর পর দেখতে পান, নিয়োগদাতাদের প্রতিশ্রুত চাকরিগুলোর বাস্তবে কোনো অস্তিত্বই নেই।

২০২৪ সালের শুরুতে মালয়েশিয়া শ্রমিক প্রবেশ বন্ধ করে দিলে বাংলাদেশে এজেন্টদের অর্থ পরিশোধ করা প্রায় ১৮ হাজার শ্রমিক মালয়েশিয়ায় ঢুকতে পারেননি।

নতুন সরকারের সময় বাংলাদেশে শুরু হওয়া অভিযানের মধ্যে এসব এজেন্টের অনেকেই গা ঢাকা দিয়েছেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই এজেন্টরা ছিলেন শেখ হাসিনা সরকারের সময়কার একটি ব্যবস্থার অংশ, যেখানে রাজনীতিবিদ ও নিয়োগকারী এজেন্টরা একসঙ্গে কাজ করে বাংলাদেশের শ্রম রপ্তানি থেকে সুবিধা নিতেন।

জনশক্তি খাতের এক নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশের মধ্যে শ্রমিক নিয়োগের পথ চালু করাটা তারেক রহমানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মাইলফলক। কারণ, বিদেশ থেকে আসা রেমিট্যান্স (প্রবাসী আয়) বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকা শক্তি।

ওই কর্মকর্তা দ্য এজ-কে বলেন, ‘বাংলাদেশ চায় না যে বিদেশি শ্রমিক নিয়োগের বর্তমান পদ্ধতি অব্যাহত থাকুক। তারা চায় মালয়েশিয়া সরকার বিদেশি শ্রমিক নিয়োগের সুযোগটি আরও বেশিসংখ্যক বাংলাদেশি কোম্পানির জন্য খুলে দিক, কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির বাছাইকৃত অল্প কিছু প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তা সীমাবদ্ধ না রাখুক।’

এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকার বর্তমানে ১০২টি অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে ৪৩২টি নিয়োগকারী সংস্থাকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনা করছে বলে জানা গেছে।

বর্তমান ১০২টি প্রতিষ্ঠান ফরেন ওয়ার্কার সেন্ট্রালাইজড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের আওতায় অনুমোদনপ্রাপ্ত। এই বিদেশি শ্রমিক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতিটি তৈরি করেছে বেস্টিনেট এসডিএন বিএইচডি।

বেস্টিনেটের প্রতিষ্ঠাতা আমিনুল ইসলাম আবদুল নূর জন্মসূত্রে বাংলাদেশি হলেও বর্তমানে মালয়েশিয়ার নাগরিক। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালে বাংলাদেশ সরকার আমিনুল ও তাঁর সহযোগী রুহুল আমিনের প্রত্যর্পণ চেয়ে আবেদন করেছিল। বিষয়টি এখনো দুই দেশের সরকার পর্যায়ে আলোচনা ও প্রক্রিয়াধীন আছে।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর প্রথম বিদেশ সফরের জন্য এমন একটি দেশকে বেছে নিচ্ছেন, যেখানে সম্ভবত এস আলম গ্রুপের সবচেয়ে জ্ঞাত আন্তর্জাতিক সম্পদ রয়েছে। আর তা হলো মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে থাকা ম্যারিয়ট ব্র্যান্ডের দুটি বড় হোটেল।

সম্পদ পুনরুদ্ধার এবং আর্থিক অপরাধে সহযোগিতার বিষয়গুলো আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিকভাবে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় স্থান পাবে কি না, তা এখনো দেখার বিষয়।

তবে এটা পরিষ্কার, বাংলাদেশ–মালয়েশিয়া সম্পর্ক বর্তমানে উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার মধ্যে আছে। আর ঠিক সে সময়েই মালয়েশিয়ায় এস আলমের সম্পদ নিয়ে নজরদারি বাড়ছে এবং মালয়েশিয়া–বাংলাদেশ শ্রমবাজার আবার চালু করার চাপও বাড়ছে বলে জানা গেছে।

স্থানীয় সূত্রগুলো দ্য এজকে বলেছে, কুয়ালালামপুরের ওই দুটি হোটেল আনুষ্ঠানিকভাবে কখনো বিক্রির জন্য বাজারে উপস্থাপন করা হয়নি। এ দুই হোটেলে মোট ৯১৯টি কক্ষ আছে।

তবে কয়েক বছর আগে মালিকপক্ষ এগুলোর সম্ভাব্য বিক্রয়মূল্য ঠিক করেছিল বলে জানা যায়। দুটি সম্পদের জন্য ১২৫ কোটি রিঙ্গিত বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ করেছিল তারা।

তবে সম্পত্তি বেচাকেনার সঙ্গে জড়িত কয়েকজন এজেন্টের মতে, এই মূল্য কিছুটা বেশি। তাঁদের ধারণা, হোটেল দুটির যৌক্তিক বাজারমূল্য ৮৫ কোটি থেকে ৯৫ কোটি রিঙ্গিতের মধ্যে হওয়া উচিত।

বাংলাদেশি শ্রমিক নিয়োগের বাজারে যে অর্থের লেনদেন হয়, তা কয়েক শ কোটি রিঙ্গিত পর্যন্ত পৌঁছায় বলে জানা গেছে। অথচ নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রকৃত খরচটা সে অঙ্কের তুলনায় অনেক কম।

মালয়েশিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে ‘নিয়োগকর্তা খরচ বহন করবে’ নীতি অনুসরণ করে। কিন্তু বর্তমান ব্যবস্থায় এই নীতির কার্যকর বাস্তবায়ন এখনো কঠিন।

মালয়েশিয়ার মানবসম্পদমন্ত্রী রামানান রামাকৃষ্ণন বাংলাদেশি শ্রমিকদের গ্রাম পর্যায়ে শোষণ বন্ধ করার জন্য তুরাপ নামে একটি নতুন ব্যবস্থা প্রস্তাব করেছেন। তুরাপও বেস্টিনেটের তৈরি একটি ব্যবস্থা।

তবে বাংলাদেশে ও মালয়েশিয়ার কিছু অংশীজনের মধ্যে এ নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। তাঁদের ধারণা, এটি আসলে আরেকটি এমন ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে বাংলাদেশি শ্রমিক নিয়োগ আবারও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের হাতেই কেন্দ্রীভূত থাকবে।

বিশ্বজুড়ে তদন্তের জাল আরও শক্ত হচ্ছে

১৯ মে নিকোসিয়ার আদালত সাইপ্রাসের পারেক্লিশিয়া এলাকায় অবস্থিত একটি দোতলা আবাসিক ভবন জব্দ করার আদেশ দেন। এই ভবনের মালিক ছিলেন বাংলাদেশি ব্যবসায়ী মোহাম্মদ সাইফুল আলম এবং তাঁর স্ত্রী ফারজানা পারভীন।

বাংলাদেশের উদ্যোগে শুরু হওয়া পারস্পরিক আইনি সহায়তা প্রক্রিয়ার আওতায় সাইপ্রাসের অর্থ পাচারবিরোধী ইউনিট মোকাস আদালতে আবেদন করার পর এই আদেশ দেওয়া হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর প্রকাশ্যে বলেছেন, এই তদন্তে ৮০০ কোটি ইউরোর (প্রায় ৩৭ বিলিয়ন রিঙ্গিত) বেশি অর্থ দেশ থেকে পাচার হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

তদন্তের মূল অভিযোগ হলো, এস আলম-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে বিপুল ঋণ নিয়েছিল। এর মধ্যে আছে—ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ এবং ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক। এসব ঋণের অনেকগুলোই পরে খেলাপি হয়ে যায়।

ওই ঋণের অর্থ সাইপ্রাস, ব্রিটিশ ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জ এবং জার্সিতে নিবন্ধিত বিভিন্ন কোম্পানি ও ট্রাস্টের জটিল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বিদেশে পাঠানো হয়েছিল কি না, তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন।

এস আলম
এস আলম
ফাইল ছবি

একলেয়ার ইন্টারন্যাশনাল নামে সাইপ্রাসে নিবন্ধিত একটি কোম্পানিও তদন্তের আওতায় আছে। ২০১৬ সালে একলেয়ার ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড কিনে নেওয়ার মাধ্যমে এস আলম এই কোম্পানির মালিকানা পান।

একই বছর এস আলম সাইপ্রাসের তথাকথিত ‘গোল্ডেন পাসপোর্ট’ বা বিনিয়োগের মাধ্যমে নাগরিকত্ব পাওয়ার কর্মসূচির আওতায় সাইপ্রাসের নাগরিকত্ব পান। পরবর্তী সময়ে সাইপ্রাস সরকার এই কর্মসূচি বন্ধ করে দেয়।

সাইপ্রাসের কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া নথি অনুযায়ী, বাংলাদেশি তদন্তকারীরা ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এস আলম এবং তাঁর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক লেনদেন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম পর্যালোচনা করছেন। এস আলমের আন্তর্জাতিক আইনজীবী দলের নেতৃত্ব দিচ্ছে কুইন ইমানুয়েল উরকহার্ট অ্যান্ড সুলিভান।

এস আলম সব ধরনের অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, তাঁর বিনিয়োগে বৈধ বিদেশি উৎস থেকে অর্থায়ন করা হয়েছে।

বাংলাদেশে আদালতের রায়

সাইপ্রাসে সম্পত্তি জব্দের আদেশের পরদিনই বাংলাদেশের একটি আদালত এস আলমের বিরুদ্ধে আরেকটি রায় দেন। গত ২১ মে এস আলম এবং তাঁর ১০ জন আত্মীয় ও সহযোগীকে পাঁচ মাসের কারাদণ্ড দেন চট্টগ্রাম অর্থঋণ আদালত-১-এর বিচারক মো. হেলাল উদ্দিন।

দণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে এস আলমের স্ত্রী, ছেলে এবং ভাইয়েরাও আছেন। তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের খাতুনগঞ্জ শাখা থেকে নেওয়া ৮৪ কোটি ৪৯ লাখ টাকা (প্রায় ৬০ লাখ ইউরো) ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়া।

এস আলম গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ওজি ট্রাভেলস লিমিটেডের জন্য ১৩৪টি বাস কেনার উদ্দেশ্যে এ ঋণ নেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করা হয়। এর মধ্য দিয়ে ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর এই প্রথম কোনো বাংলাদেশি আদালত আনুষ্ঠানিকভাবে এস আলমকে সাজা দিলেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনা সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় এস আলম গ্রুপ বিপুল আর্থিক প্রভাব অর্জন করেছিলেন বলে অভিযোগ আছে।

শেখ হাসিনার পতনের পর থেকে এস আলম ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের জনসমক্ষে দেখা যায়নি। ধারণা করা হয়, তাঁরা বর্তমানে সিঙ্গাপুরে বসবাস করছেন।

আরও পড়ুন

সিঙ্গাপুরের সাম্রাজ্য তদন্তের আওতায়

২০২৩ সালে সিঙ্গাপুরের নাগরিকত্ব পান এস আলম। এখন সিঙ্গাপুর তাঁর বিদেশি সম্পদের প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশি তদন্তকারীদের অভিযোগ, এস আলম সিঙ্গাপুরে অন্তত ১০০ কোটি সিঙ্গাপুরি ডলার (প্রায় ৩১৩ কোটি রিঙ্গিত) মূল্যের ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন। এর মধ্যে আছে—হোটেল, আবাসন, খুচরা বাণিজ্যিক সম্পত্তি এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শেয়ার।

অভিযোগ আছে, বিদেশে অর্থ স্থানান্তর বা বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি ছাড়াই অর্থ পাচার করে এসব সম্পদ অর্জন করা করা হয়েছে।

আগের বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে ২০১৪ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে এস আলমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বেশ কয়েকটি সম্পদ কেনার তথ্য উঠে এসেছে। এর মধ্যে আছে—৩২৮ কক্ষের হোটেল গ্র্যান্ড চ্যান্সেলর সিঙ্গাপুর, যা ১৭ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলারে কেনা হয়েছিল। এ ছাড়া সিঙ্গাপুরের লিটল ইন্ডিয়া এলাকায় ১০ কোটি ৫৩ লাখ মার্কিন ডলারে খুচরা বাণিজ্যিক স্থান কেনা হয়। ২০১৯ সালে আরও ১২ কোটি ৫৬ লাখ মার্কিন ডলারে কেনা হয় আইবিস সিঙ্গাপুর নোভেনা।

এদিকে ২০২৫ সালের জুলাই মাসে ঢাকার একটি আদালত আলমের ৪০টি ব্যাংক হিসাব, তাঁর স্ত্রীর ৬টি হিসাব এবং সিঙ্গাপুরে নিবন্ধিত ৮টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার জব্দ করার নির্দেশ দেন।

এ ছাড়া তাঁর দুই ছেলে আশরাফুল আলম ও আহসানুল আলম, আত্মীয় আহমেদ বেলাল এবং বোন মাইমুনা খানম-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অতিরিক্ত হিসাবও জব্দ করা হয়। সিঙ্গাপুরে স্বামী-স্ত্রীর যৌথ মালিকানাধীন দুটি প্রতিষ্ঠানে মোট প্রায় ৬৮ লাখ সিঙ্গাপুরি ডলারের বিনিয়োগও অবরুদ্ধ করা হয়।

সিঙ্গাপুরের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)-কে চিঠি দিয়ে এস আলম গ্রুপের দেশি–বিদেশি সম্পদের বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে। এতে ধারণা করা যায়, সিঙ্গাপুরের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে।

বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) আলাদা করে অভিযোগ করেছে, এস আলম বিদেশে সর্বোচ্চ ১ হাজার ২৮৯ কোটি সিঙ্গাপুরি ডলার পর্যন্ত অর্থ পাচার করেছেন। এর মধ্যে কানালি লজিস্টিকস নামের সিঙ্গাপুরভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেও অর্থ পাচারের অভিযোগ আছে। পরে এ প্রতিষ্ঠানটিই মালয়েশিয়ায় আবাসন খাতে সম্পদ কেনার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল।

এস আলমের সিঙ্গাপুরের আইনজীবী প্রতিষ্ঠান ওং পার্টনারশিপ এসব বাংলাদেশি কার্যক্রমকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উল্লেখ করেছে। তাদের দাবি, সম্পদ জব্দের পদক্ষেপগুলো ‘অবৈধ, খামখেয়ালিপূর্ণ এবং বৈষম্যমূলক’ পদ্ধতিতে নেওয়া হয়েছে। এতে বৈধ ব্যবসায়িক কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সমন্বিত আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ

ঘটনাগুলোর ধারাবাহিকতা, চট্টগ্রামে আদালতের সাজা, নিকোসিয়ায় সম্পদ জব্দ এবং সিঙ্গাপুরে বাড়তে থাকা চাপ—এসবের মধ্য দিয়ে বোঝা যায়, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এখন আরও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষ এটিকে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আর্থিক অপরাধের ঘটনাগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করেছে।

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে অর্থ পাচার প্রতিরোধবিষয়ক জাতীয় সমন্বয় কমিটি বলেছে, অর্থ পাচারের ঘটনায় এস আলম গ্রুপসহ ১০টি বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর ৬৬ হাজার ১৪৬ কোটি টাকা মূল্যের সম্পদ জব্দ করা হয়েছে। শেখ হাসিনা সরকারের সময় এ অর্থ পাচারের ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ আছে।

ইন্ডিয়া টুডের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত শ্বেতপত্র কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, শেখ হাসিনার শাসনামলে প্রায় ২৩ হাজার ৪০০ কোটি মার্কিন ডলার পরিমাণ অর্থ অবৈধভাবে পাচার হয়ে থাকতে পারে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এস আলম ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা দুবার আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশি নাগরিকত্ব ছাড়ার আবেদন করেছেন। গত নভেম্বরে বাংলাদেশের হাইকোর্ট প্রথম আবেদন গ্রহণের প্রক্রিয়া স্থগিত করেন। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে নতুন আবেদন করা হলেও পরে আদালতের স্থগিতাদেশের কারণে সেটিও আটকে যায়। এতে এস আলম পরিবার বর্তমানে একটি আইনি অনিশ্চয়তার মধ্যে আছে।

কর্তৃপক্ষের আশঙ্কা, তাঁদের নাগরিকত্ব ছাড়ার অনুমতি দিলে অর্থ পাচারের অভিযোগে সম্পদ পুনরুদ্ধার, দেশীয় সম্পত্তি জব্দ এবং চলমান আন্তর্জাতিক সালিশি কার্যক্রমে বাংলাদেশের অবস্থান রক্ষার প্রচেষ্টা বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

একসময় যে ব্যক্তি বাংলাদেশের অন্তত সাতটি ব্যাংক, একটি বড় শিল্পগোষ্ঠী এবং কুয়ালালামপুর থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত ঝকঝকে হোটেল সাম্রাজ্যের ওপর প্রভাব বিস্তার করতেন, তাঁর জন্য পৃথিবী এখন দ্রুতই অনেক ছোট হয়ে আসছে।

Post a Comment

0 Comments